এখন থেকে পাসপোর্ট আবেদনের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হবে না। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষণার পর সরকার পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া থেকে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক রাখার নিয়ম বাতিল করতে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করেই পাসপোর্ট প্রদান করা হবে। এই নতুন ব্যবস্থা পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করে তুলবে।

সোমবার প্রধান উপদেষ্টা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপ অনুমোদন করেছেন বলে জানিয়েছেন তার উপ প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করলেই, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। এই পরিবর্তনটি নাগরিকদের জন্য একটি বড় সুবিধা বয়ে আনবে, বিশেষ করে যারা দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট পেতে চান তাদের জন্য।

এর আগে, রবিবার ডিসি সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা এই পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। এরপর সোমবার, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকদের পাসপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ। এই পদক্ষেপটি পাসপোর্ট সেবাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণের উদ্যোগ

সরকার পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে পাসপোর্ট প্রদান, যা পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনবে। এই নতুন ব্যবস্থা নাগরিকদের সময় ও অর্থ দুটিই বাঁচাবে।

 নতুন প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহ:

  • জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে পাসপোর্ট: 
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করেই পাসপোর্ট প্রদান করা হবে, ফলে আবেদনকারীদের আলাদা করে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। এই ব্যবস্থা পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করে তুলবে।
  •  
  • অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জন্মনিবন্ধন সনদ: 
  • যেসব নাগরিকের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাদের ক্ষেত্রে এনআইডির পরিবর্তে জন্মনিবন্ধন সনদ যাচাই করেই পাসপোর্ট দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থা শিশু ও কিশোরদের জন্য পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
  •  
  • বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সুবিধা: 
  • প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যও পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই অনলাইনে যাচাই করা জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রদান করা হবে। এই ব্যবস্থা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় সুবিধা বয়ে আনবে।
  •  
  • পাসপোর্ট পুনঃইস্যু সহজতর করা: 
  • পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে মৌলিক তথ্য (নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান) পরিবর্তন না হলে শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করেই পাসপোর্ট প্রদান করা যাবে। এই ব্যবস্থা পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে।
  •  
  • তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্ত সম্পন্ন গণ্য করা হবে: 
  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন ডেটাবেজের সঙ্গে পাসপোর্ট আবেদনের তথ্য যাচাই করা হলে তা “বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩-এর ৫(২) ধারার অধীনে প্রয়োজনীয় তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে” বলে বিবেচিত হবে। ফলে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের সুযোগ কমে আসবে।

পাসপোর্ট সেবা ও এর গুরুত্ব

  • বাংলাদেশের এক কোটির বেশি নাগরিক বিদেশে কর্মরত: 
  • প্রতি মাসে গড়ে ৩০ হাজার বাংলাদেশি নতুন করে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যান। এছাড়া উচ্চশিক্ষা, স্থায়ী বসবাসসহ বিভিন্ন কারণে বিপুল সংখ্যক নাগরিকের পাসপোর্ট প্রয়োজন হয়। এই নতুন ব্যবস্থা তাদের জন্য পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করবে।
  •  
  • প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার আবেদন গ্রহণ ও ২৫-২৮ হাজার পাসপোর্ট ইস্যু: 
  • দেশ ও বিদেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ে এবং ছাপানো হয়। এই নতুন ব্যবস্থা আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে।
  •  
  • ই-পাসপোর্ট সিস্টেমের সুবিধা: 
  • বর্তমান ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন দাখিল করা, ফি পরিশোধ করা, নির্ধারিত দিনে বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান এবং পরে অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। এই ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সুবিধাজনক করে তুলেছে।
  •  
  • পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে ভোগান্তি কমবে: 
  • অনেক সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়া বা অতিরিক্ত কাগজপত্র যাচাইয়ের কারণে আবেদনকারীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় এসব জটিলতা কমে আসবে।
  •  

বিভিন্ন পেশার জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা

  1. শিক্ষার্থী: উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট আবশ্যক। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট পেতে পারবেন।
  2. চাকরিজীবী: বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থায় চাকরিজীবীরা সহজেই পাসপোর্ট পাবেন।
  3. ব্যবসায়ী: আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পাসপোর্ট আবশ্যক। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট পেতে পারবেন।
  4. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী: বিদেশে চিকিৎসা সেবা বা প্রশিক্ষণের জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজেই পাসপোর্ট পাবেন।
  5. প্রবাসী শ্রমিক: বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাসপোর্ট আবশ্যক। নতুন ব্যবস্থায় প্রবাসী শ্রমিকরা দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট পেতে পারবেন।

এই নতুন ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করে তুলবে। এটি নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।