ঢাকার কাছাকাছি একদিনে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য চমৎকার ভ্রমণ! নিচে আরও কিছু তথ্য ও টিপস সংযোজন করা হলো, যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সহায়ক হতে পারে:
১. পানাম সিটি ও লোকশিল্প জাদুঘর
-
টিপস: সকালে যাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ দুপুরের পর ভিড় বাড়ে। জাদুঘরে ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য আলাদা ফি দিতে হতে পারে।
-
স্থানের বর্ণনা: হারিয়ে যাওয়া শহর হিসাবে পরিচিত পানাম নগর বা পানাম সিটি ঢাকার পার্শবর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি এই পানাম নগর। এর পাশেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে বিশাল এলাকা জুরে নির্মিতি বাংলাদেশ লোকশিল্প জাদুঘর অবস্থিত। এখানে ঐতিহাসিক সব নিদর্শন দেখার পাশাপাশি সল্পমূল্যে কিনতে পাবেন জামদানি শাড়ি।
-
যাতায়াত: গুলিস্তান থেকে স্বদেশ, বোরাক ও সোনারগাঁ নামক বাসে উঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। মোগরাপাড়া থেকে পানাম সিটি বা লোকশিল্প জাদুঘরের দূরত্ব প্রায় ২ কি.মি.। চাইলে রিক্সা অথবা সিএনজি তে করে যেতে পারেন।
-
কাছাকাছি খাবার: সোনারগাঁওয়ের স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোতে ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন কাচ্চি বিরিয়ানি বা মোরগ পোলাও চেখে দেখতে পারেন।
২. বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
-
টিপস: এই জমিদার বাড়ির বিশাল সব স্থাপনা আপনাকে নি:সন্দেহে অবাক করবে । জমিদার বাড়ির পুরোটাই মনোরম পরিবেশে ঘেরা! প্রতি সপ্তাহে রোববার ও সোমবার অর্ধবেলা ছাড়া প্রতিদিনই সকাল ৯.০০টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা পর্যন্ত গেট দর্শনার্থীদের জন্য গেট উন্মুক্ত থাকে।
-
অনন্য তথ্য: বাড়ির পেছনে একটি গোপন সুড়ঙ্গ আছে বলে জানা যায়, যা জমিদারদের জরুরি সময়ে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
-
স্থানের বর্ণনা: বালিয়াটি জমিদারবাড়ির স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন, উপনিবেশিক ধাঁচের। বাড়ির প্রতিটি প্রাসাদে সূক্ষ্ম কারুকাজ ও নকশা সহজেই পর্যটকের দৃষ্টি কাড়ে। বিশেষ করে সামনের সারির প্রাসাদের থামগুলোর ওপরের দিকে সর্পাকৃতি ও মানুষের মাথার অপূর্ব নকশা সবাইকে মোহিত করে। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের বড় জমিদার বাড়িগুলোর একটি। মোট সাতটি স্থাপনা নিয়ে এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। এছাড়াও রয়েছে সান বাধানো পুকুর ঘাট।
-
খাবার: মানিকগঞ্জের বিখ্যাত কালাই রুটি বা মিষ্টি দই খেতে ভুলবেন না।
-
যাতায়াত: ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় বালিয়াটি গ্রামে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি অবস্থিত। ঢাকার গাবতলী থেকে এসবি লিংক ও জনসেবা বাসে সাটুরিয়া যাওয়া যাবে। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৭০-৮০ টাকা। সাটুরিয়া পৌঁছে সেখান থেকে রিকশা বা ভ্যানে করেও যাওয়া যায়।
৩. জিন্দা পার্ক
-
টিপস: পার্কে বোট রাইড (২০-৩০ টাকা) এবং জেব্রা, হরিণ দেখার সুযোগ আছে। শীতকালে পিকনিকের জন্য আদর্শ।
-
স্থানের বর্ণনা: সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশের ছোয়া পেতে নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত জিন্দা পার্ক হতে পারে একটি আদর্শ জায়গা। ঢাকা থেকে দুরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। ১৫০ একর জায়গা নিয়ে এই জিন্দা পার্কটি গড়ে উঠেছে। দশ হাজারের বেশি গাছ, ৫টি জলধার ও অসংখ্য পাখি রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ক্যান্টিন , লাইব্রেরি, মিনি চিড়িয়াখানা ও জলাধারে ঘোরার জন্য নৌকা। খাওয়া দাওয়ার জন্য পার্কের ভিতরেই রেস্টুরেন্ট আছে।
-
অনন্য তথ্য: প্রবেশমূল্যঃ প্রাপ্তবয়স্ক ১০০ টাকা, ছোটোদের ৫০ টাকা।
-
যাতায়াত : জিন্দা পার্ক যাবার সবচেয়ে সহজ উপায় হল ৩০০ ফিট দিয়ে। সেখান থেকে যেতে হবে কাঞ্চন ব্রিজ। এরপর ঢাকা সিটি বাইপাস ধরে কিছু দুরেই জিন্দা পার্ক।
অথবা ঢাকা হতে টঙ্গী মীরের বাজার হয়ে বাইপাস রাস্তা দিয়েও যাওয়া যায়। এছাড়া কাঁচপুর ব্রিজ দিয়ে ভুলতা গাওছিয়া হয়ে বাইপাস দিয়ে কাঞ্চন ব্রিজ হয়ে জিন্দা পার্কে যাওয়া যায়।
৪. গোলাপ গ্রাম
-
টিপস: নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি (গোলাপ ফোটার মৌসুম)। সকাল ৭-৯ টার মধ্যে ফুল তোলার দৃশ্য দেখা যায়।
-
স্থানের বর্ণনা: একটু মুক্ত হাওয়া আর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের ‘গোলাপ গ্রামে’। এই ইউনিয়নের সাদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া গ্রামজুড়ে আছে গোলাপের রাজ্য। যতদূর চোখ যায়, শুধু গোলাপ আর গোলাপ। তাই এ গ্রামগুলো এখন ‘গোলাপ গ্রাম’ নামেই বেশি পরিচিত। গোলাপ গ্রামের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় মূলত গোলাপের সিজনে, শীতে। পুরো গ্রামেই রয়েছে গোলাপ সহ রজনীগন্ধা, চন্দ্রমল্লিকার ক্ষেত।
-
যাতায়াত : মিরপুর দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে সাহদুল্লাহপুর ঘাটের উদ্দেশ্যে ৩০ মিনিট পরপর ইঞ্জিনচালিত বোট ছাড়ে। সাদুল্লাহপুর যেতে যেতে ৪৫ মিনিট- ১ ঘণ্টা লাগবে। এছাড়া মিরপুর শাহআলী মাজার এর সামনে কোনাবাড়ী বাসষ্ট্যান্ড থেকে বাসে করে আকরান বাজার। আকরান বাজার থেকে অটোতে করে ফুলের বাজারে কিংবা সাদুল্লাহপুর গ্রাম।
-
সতর্কতা: ফুলের বাগানে প্রবেশের আগে স্থানীয়দের অনুমতি নিন।
৫. মহেরা জমিদার বাড়ি
-
টিপস: এটি "নীলকুঠি" নামেও পরিচিত, কারণ ব্রিটিশ আমলে এখানে নীল চাষ নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
-
স্থানের বর্ণনা: টাঙ্গাইলে ঘোরার মত অনেক জায়গা আছে যা এক দিনে ঘুরে শেষ করা কঠিন। তার মধ্যে মহেরা জমিদার বাড়ি সবচেয়ে সুন্দর। বর্তমানে এটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি তিনটি স্থাপনা নিয়ে তৈরি। বাড়ির ভেতরের দিকে বিশাল খাঁচায় বিভিন্ন রকম পাখি পালা হয়। রয়েছে একটি সুদৃশ্য কয়েকটি পুকুরও।
-
যাতায়াত : টাঙ্গাইলের ঝটিকা বাস সরাসরি মহেরা পর্যন্ত যায় না, নাটিয়া পাড়ায় নামতে হবে। সময় লাগবে ২-২.৩০ ঘন্টার মত। এরপর একটা অটো রিকশা নিয়ে সহজেই মহেরা জমিদার বাড়ি যেতে পারবেন। (এছাড়া মহাখালি থেকে “ঝটিকা সার্ভিস” নামে একটি বাস যায়)
৬. মৈনট ঘাট
-
সানসেট ভিউ: সন্ধ্যায় পদ্মার সূর্যাস্ত দেখার জন্য বিখ্যাত। স্থানীয় নৌকায় চড়ে নদীতে ঘুরতে পারেন (৫০-১০০ টাকা)।
-
টিপস: নবাবগঞ্জের জজবাড়ি, উকিলবাড়ি, খেলারাম দাতার বাড়ি সহ আরও কিছু দর্শনীয় স্থান এবং আনসার ক্যাম্পে হরিণ ও পাখি দেখা যায়।
-
স্থানের বর্ণনা: দোহারের মৈনট ঘাট গিয়ে দেখা পাবেন প্রমত্তা পদ্মা নদীর। পদ্মা পারের বিস্তৃত প্রান্তর সময় কাটনোর জন্য এক দারুন জায়গা। যাওযার পথে রুটে পাশাপাশি দেখে যেতে পারবেন আরও কিছু দর্শনীয় স্থান।
-
যাতায়াত : ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা যমুনা পরিবহনে চেপে বসা। ফেরার সময় একই বাসে আবার ঢাকা চলে আসবেন। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬ টায়।
৭. বাংলার তাজমহল
-
টিপস: সপ্তাহ ভিড় এড়াতে শুক্রবার যান।
-
প্রবেশ ফি: ৫০ টাকা (২০২৩ পর্যন্ত)। ভেতরে মিনি মিউজিয়াম ও ফোয়ারা আছে।
-
স্থানের বর্ণনা: চলচিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ মনি আগ্রার তাজমহলের আদলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নির্মান করেছেন তাজমহল। রেপ্লিকা হলেও প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নির্মান করা হয়েছে।
-
যাতায়াত : ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে ভৈরব, নরসিংদী কিংবা কিশোরগঞ্জগামী বাসে বরপা বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিএনজিতে করে বাংলার তাজমহল দেখতে যেতে পারবেন।
৮. মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি
-
টিপস: প্রায় ৬২ বিঘা জমির উপর বাবু রামরতন ব্যানার্জী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত
-
স্থাপত্য: গ্রিক কলাম ও ইউরোপীয় ডিজাইনের মিশ্রণ। কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশে অনুমতি নিতে হবে।
-
স্থানের বর্ণনা: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১৮৮৯ সালে প্রায় ৬২ বিঘা জমির উপর বাবু রামরতন ব্যানার্জী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়িটিও ঐতিহাসিক নিদর্শন ধারন করে আছে। বর্তমানে এটি একটি কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা সরকারি মুড়াপাড়া কলেজ নামে পরিচিত।
-
যাতায়াত: ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ি বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে (মেঘলা, আসিয়ান বা গ্লোরি) করে ভুলতা বা রূপসী বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে। নরসিংদী ও ভৈরবগামী বাসে ভুলতা এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে (জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া) দিয়ে সরাসরি মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি যাওয়া যায়।
৯. বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক
-
টিপস: পার্কের ভিতরের অংশকে আবার ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে – কোর সাফারি, সাফারি কিংডম, বায়োডাইভার্সিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান ডাইভার্সিটি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু স্কয়ার।
-
টিকেট: প্রাপ্তবয়স্ক ১০০ টাকা, শিশু ৫০ টাকা। গাড়ি ভেতরে নিয়ে গেলে আলাদা ফি।
-
মাস্ট-সি: সাফারি কিংডমে সিংহ-বাঘ দেখার জন্য জিপ সার্ভিস (২০০-৩০০ টাকা) নিতে পারেন।
-
স্থানের বর্ণনা: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে প্রায় ৩,৬৯০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কটি। পার্কের ভিতরের অংশকে আবার ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে – কোর সাফারি, সাফারি কিংডম, বায়োডাইভার্সিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান ডাইভার্সিটি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। এছাড়াও এখানে রয়েছে পাখি শালা, প্রজাপতি সাফারি, জিরাফ ফিডিং স্পট, অর্কিড হাউজ, শকুন ও পেঁচা কর্নার, এগ ওয়ার্ল্ড, বোটিং, লেইক জোন, আইল্যান্ড, প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র, ফ্যান্সি কার্প গার্ডেন আরো অনেক বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীর সমারোহ।
-
যাতায়াত: ঢাকা - গাজীপুরের বাসে গেলে বাঘের বাজার নামতে হবে। সেখান থেকে খুব সহজে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে যেতে পারবেন।
১০. নুহাশ পল্লী
-
টিপস: জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার অবকাশযাপন ও শ্যুটিং করার জন্য নির্মান করেছিলেন।
-
বিশেষ দিন: শীতকালে "হুমায়ূন মেলা" হয়। লেকের পাশের কটেজে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।
-
টিকেট: যদিও এখন টিকিট ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ
-
স্থানের বর্ণনা: জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার অবকাশযাপন ও শ্যুটিং করার জন্য নির্মান করেছিলেন নুহাশ পল্লী। প্রাকৃতিক আর কৃত্রিমতার মিশ্রণে তৈরি জায়গাটিতে ঘুরতে মন্দ লাগবেনা।
-
যাতায়াত :ঢাকা গাজীপুর রাস্তার হোতাপাড়া বাস স্ট্যান্ডে নেমে অটো রিকশা বা সিএনজিতে করে নুহাশ পল্লী যাওয়া যায়।
অতিরিক্ত সুপারিশ/উপদেশঃ
-
ভ্রমণের সময়: প্রতিটি স্থানে ২-৩ ঘণ্টা বরাদ্দ রাখুন।
-
সতর্কতা: শীতকালে ভোরে রওনা দিন, গ্রীষ্মে হ্যাট ও পানি সঙ্গে নিন।
-
অ্যাপস: "Pathao" বা "Uber" ব্যবহার করে সিএনজি বুকিং করতে পারেন।
ঢাকার বাইরে প্রকৃতির কোলে ছোট্ট এই ভ্রমণগুলো মানসিক প্রশান্তি দেবে। Happy Travelling! 🌿
মন্তব্য (0)
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!